Published On: মঙ্গল, আগ ১৬, ২০১৬

পাহাড়ের নীচে লুকিয়ে থাকা পিরামিড রহস্য

Big_Pyramid_1
রহস্যময় পিরামিড যে শুধু মিসরেই নেই ছড়িয়ে রয়েছে সারা পৃথিবীতে, আজ তা সবারই জানা। মেক্সিকোর চলুলায় মাটির নীচে যে পিরামিডের সন্ধান পাওয়া গেছে বলা হচ্ছে, তা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তবে কে বা কারা এটি কেন নির্মাণ করেছিল তা এখনও অজানা। হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অজানা রহস্য হয়ে থাকা পিরামিড নিয়ে সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি’তে লিখেছেন, জারিয়া গরভেট।

১৫১৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্প্যানিশ বাহিনী নিয়ে হারনান করটেজ পবিত্র নগরী চলুলায় চালায় নিকৃষ্টতম হত্যাযজ্ঞ। স্থানীয় যোদ্ধাদের সঙ্গে মাসের পর মাস লড়াই, অনাহার ও অজানা রোগে কাহিল হারনান করটেজের স্প্যানিশ বাহিনী যখন শহরটিতে ঢোকেন তখন কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থার মুখোমুখিই হননি। যদিও তার সৈন্য সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার।

স্থানীয় অধিবাসীরা মনে করেছিল, তাদের এই পবিত্র নগরীর ওপর রয়েছে দেবতার আশীর্বাদ। কোনো কিছুতেই এই নগরীর কোনো অনিষ্ট হবে না। আর তাই অস্ত্রের খরচ কমিয়ে দিয়ে নগরবাসী নির্মাণ করে মন্দিরের মতো উপাসনালয়। বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট। তিনিই তাদের রক্ষা করবেন সব বিপদ-আপদ থেকে।

অবশ্য এই ধারণা যে ভুল ছিল তা চরম মূল্য দিয়ে বুঝতে পারে তারা। করটেজের নেতৃত্বে স্প্যানিশ সৈন্যরা শহরে হত্যা আর লুটপাটে মেতে ওঠে। মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে সৈন্যরা হত্যা করে তিন হাজার নগরবাসীকে। তাদের সাধের পিরামিডের ওপর কুণ্ডুলি পাকিয়ে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। শহরের প্রায় দশ শতাংশ অধিবাসী সেদিন প্রাণ হারায়।

মেক্সিকোর চলুলায় পরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে স্প্যানিশরা। প্রয়োজন অনুসারে গড়ে তোলে নিজস্ব অবকাঠামো। বিজয়ের নিদর্শন এঁকে দেয় শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের শৃঙ্গে। যেখানে ‘দ্য ইগলেসিয়া নুয়েস্ত্র সেনোরা ডি লস রেমেডিওসা’ নামে তারা একটি গির্জা নির্মাণ করে।

তবে কিছু মানুষের ধারণা ছিল, এই গির্জার ঠিক নীচেই রয়েছে প্রাচীন এক পিরামিড। যা চাপা পড়ে গেছে গাছ, মাটি ও ঘাসের নীচে। আসলে পিরামিডটি ছিল বিশাল। আয়তনে এটি চওড়ায় ৪৫০ মিটার এবং উচ্চতায় ৬৬ মিটার। অর্থাৎ আকারে প্রায় ৯টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমান। এই হলো গ্রেট পিরামিড অব চলুলা।

সে হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড এটি। এমনকি মিশরে অবস্থিত গিজার গ্রেট পিরামিডের চেয়েও এটি অন্তত চারগুণ বড়। গিজার কাছের পিরামিডগুলোর হিসেবে তা আরো প্রায় দ্বিগুন।

সভ্যতার ইতিহাসে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত যতো পিরামিড বা স্মৃতিসৌধ আছে তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। স্থানীয়রা বলে থাকেন ট্রালাচিচুয়াল্টেপেটি অর্থাৎ মানুষের তৈরি পাহাড়।

স্থানীয়রা ১৯১০ সালের দিকে ঐ এলাকায় একটি পাগলা গারদ নির্মাণ শুরু করে। এর নীচে যে পিরামিড, এর আগে পর্যন্ত কেউ তা জানতো না। খনন কাজ শুরু হলে নানা ভয়াবহ সব ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে থাকে। এর বেশ কিছু নমুনাও পাওয়া যেতে থাকে। এগুলোর মধ্যে শিরশ্ছেদ করা শিশুর মাথার খুলি অন্যতম।

প্রশ্ন হলো, এগুলো এলো কোথা থেকে? আর কেনই বা এগুলোর কথা গোপন ছিল এতোদিন?

এসব পিরামিড আকারে বিশাল হলেও পূর্ব ইতিহাস সম্পর্কে খুব কমই জেনেছে মানুষ। ধারণা করা হয়, যিশুখ্রিষ্টের জন্মেরও প্রায় তিন শ’ বছর আগে শুরু হয় এর নির্মাণ কাজ। কিন্তু কে শুরু করেছিলেন তা আজও রহস্য!

নগরের স্থানীয়রা আবার চলুটেকা নামে পরিচিত। চলুটেকা মানে বহু জাতির সমাহার। ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ডেভিড কারকালো বলছেন ‘দেখে মনে হয় অভিবাসনের ফলে বহু জাতি-গোষ্ঠীর লোকজন একই সঙ্গে এখানে বসবাস করতেন।’

মেক্সিকোর উঁচুভূমির খুব চমৎকার জায়গায় ছিল চলুলার অবস্থান। বাণিজ্যিক স্থান হিসেবেও শহরটি খ্যাতি লাভ করে। যে খ্যাতি অটুট ছিল হাজার বছর ধরে। এর উত্তরে ছিল টলটেকা-ছিছিমেকা রাজ্য আর মায়ারা ছিল দক্ষিণে।

স্পেনের বাইরে সবচেয়ে সুন্দর শহর হিসেবে একে অভিহিত করেছিলেন করটেজ। সত্যিকার অর্থেই, করটেজ যখন এখানে আসেন তখন চলুলা ছিল আজটেক সাম্রজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরটি হাত বদল হয়েছে।

আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এখানে মাত্র একটি নয়, কমপক্ষে ছয়টি পিরামিড রয়েছে। একটির ওপর আরেকটি পর্যায়ক্রমে স্থাপন করা হয়েছে। যেন এটি ধারাবাহিক সভ্যতার নিদর্শন।

ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্মতাত্ত্বিক গবেষক কারবালো বলছেন, ‘দেখে মনে হয়, নিদর্শনটি অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।’

লোককাহিনীতে বলা আছে, বিজেতা সেনাদের আসার কথা শুনে স্থানীয়রা মহামূল্যবান উপসনালয়টি নিজেরাই ঢেকে দেয় মাটি দিয়ে। যদিও এটি লোকগাথা ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে এগুলো নষ্ট হলে তা হয়েছে দুর্ঘটনাবশত। কেননা, অবিশ্বস্য হলেও একথা সত্যি যে, পৃথিবীর এই বৃহত্তম পিরামিডটি তৈরি হয়েছে কাদামাটি দিয়ে।

এই পিরামিডের ইট তৈরি করা হয়েছে কাদা, বালু, খড় ও অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে। এরপর রোদে শুকিয়ে সেগুলোকে শক্ত করা হয়। তৈরির সময় পিরামিডের বাইরের দিকে স্থাপন করা হয় রঙিন ইট। মূলত এই উপাসনালয় লাল, কালো ও হলুদ রঙের।

শুকনো আবহাওয়ায় এ ধরনের ইট খুবই টেকসই হয়। তাই হাজার হাজার বছর ধরে এগুলো টিকে থাকলেও অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

বর্তমানে শহরটিতে অবস্থিত পিরামিডটি সংস্কার করা হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে টানেলটির প্রবেশপথ আবিস্কার হয়। ঔপনিবেশিক বিজয়ের প্রায় ৫শ’ বছর পর পর্যটকদের জন্য এটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

(Visited 1 times, 1 visits today)

Editor : Rahmatullah Bin Habib


55/B, Purana Palton, Dhaka-1000


Email : nobosongbad@gmail.com


copyright @nobosongbad.com


পাহাড়ের নীচে লুকিয়ে থাকা পিরামিড রহস্য