Published On: শুক্র, জুন ২, ২০১৭

যদি আমি রাজা হই

|| মুহম্মদ নিজাম || 

‘চৈত্রের আজ  কত তারিখ বলতে পারবে?’
আমি বললাম,‘জি না। এটা যে চৈত্র মাস তা-ই আপনি না বললে আমার জানা হত না।’
জগলু চাচা জানালা থেকে মুখ সরিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালেন। কী ভেবে একটু যেন হাসলেন। এটা এক প্রকার করুণারই বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। আমাদের (কোন এক প্রত্যন্ত মফস্বলের রাজনৈতিক কর্মী) দুরবস্থা অনুধাবন করে আজকাল চাষাভুষা থেকে শুরু করে কামার, কুমার, মুচি-কুলিরা পযর্ন্ত দিন রাত্রি হা-হুতাশ করছে। অন্তরে ব্যথাবোধ করছে। তাদের আহত দৃষ্টি আমাদের লজ্জা দেয়। কিন্তু যখন অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালজ করে আমাদের খুব ভাল লাগে,আমরা প্রেরণা পাই।

জগলু চাচা বললেন, ‘একটা কথা ভেবে আমি খুব অবাক হচ্ছি। আমার সাথে কথা বলার জন্যে ওরা তোমাকে পাঠাল কেন?’
‘সবাই জানে আপনার সাথে আমার খুব ভাব!’ সুযোগ বুঝে আমিও তাকে একটু ন্যাতানোর চেষ্টা করলাম। তিনি বললেন,‘ভাবের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক কী?’ কথাটা বলে তিনি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। মনে মনে বরং খানিকটা বিরক্ত হলাম তার কথা শুনে।

তিনি বললেন,‘তোমার বয়স কত?’
আমি বললাম, ‘একুশ।’
‘ভোট উঠেছে?’
‘জি।’
‘আগের বার কাকে ভোট দিয়েছ?’
‘কাউকেই না। এবারই প্রথম ভোট।’
‘অ। ভাল। বিরোধী দল থেকে এবার কাকে নমিনেশন দেয়া হচ্ছে, অলি মজুমদার?’
‘জি।’
‘সম্পর্কে সে তো আবার তোমার তালুই হয়?’
আমি লাজুক হেসে মাথা নাড়লাম। বললাম,‘অনেক ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে দূর সম্পর্কের।’

জগলু চাচার ছোট বোনের মেয়ে রেবতি মাথা নুইয়ে অঙ্ক করছিল। সে হঠাৎ কী ভেবে ফিক করে হেসে উঠল। জগলু চাচা ভ্রুঁ কুঁচকে একবার ওদিকে তাকালেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন,‘বল, তোমাদের কী ইচ্ছে? আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই এই তো চাইছে সবাই?’
‘না, না। আপনি নিজের ইচ্ছায় নির্বাচন করবেন এতে নাক গলাবে কে? সমস্যা হলো আপনার লিফলেট ব্যানারে লিখা…’
তিনি হাত উঁচিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন,‘আমি কি নেতিবাচক কিছু লিখেছি? দেশ কিংবা দশের খারাপ হয় এমন কিছু?’
‘জি না।’
‘তাহলে আর ওসব নিয়ে কথা কেন? অন্য কিছু বলার থাকলে বল।’ কথাটা বলে তিনি একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করলেন। আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।

নিজের মুখটা এখন আয়নায় দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। কপালে নিশ্চই কয়েকটা খাড়া ঢেউয়ের উদয় হয়েছে। চোখজোড়া হয়ে যাবার কথা সরু এবং খানিকটা সন্ধিগ্ধ। আমার দরজার ব্যাক সাইডে মস্ত একটা আয়না লাগানো। ওর সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রায়ই হাসি, নাচানাচি করি । মাঝে মধ্যে রাগও করি । রাগলে দেখেছি আমাকে একেবারে মন্দ লাগে না। দেখতে ভালো লাগলেও সমস্যা হয় অন্য কোথাও। আর সবার মতই আমিও তখন যুক্তি হারিয়ে ফেলি। কথা বলি গায়ের জোড়ে। এখানে অবশ্যি আমার যুক্তি-চুক্তির জ্ঞান হারালে চলবে না। জগলু চাচা আমাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী। নিজেদেরই লোক। পার্টির পক্ষ থেকে তার সাথে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি। কথাগুলি অবশ্যই গুছিয়ে বলতে হবে। আমার সাথে আরো দুজনের এখানে আসার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে তাদের বাড়ন করা হয়েছে। জগলু চাচা খামখেয়ালি মেজাজের মানুষ। এক সাথে তিন চারজনকে হামলা দিতে দেখে কি-না-কি করে বসেন তার ঠিক নেই। সেই জন্যে শুধু আমাকে পাঠানো হয়েছে। আমার কাজ হচ্ছে তার হাবভাব কিংবা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে একটা প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করা, পাশাপাশি হালকা ভাবে একটু সতর্ক করে দিয়ে যাওয়া।

অনেক টালবাহনার পর জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। আইনগত নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা আগের মত লাফিয়ে দাপিয়ে প্রার্থী নিয়ে ঘুরতে পারছি না। ছোট ছোট টিম তৈরি করে সারা তল্লাটে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কাজ করতে হচ্ছে গোপনে। মানুষের হাতে ধরে পায়ে ধরে ভোট ভিক্ষা চাওয়া হচ্ছে। ভালই সাড়া সম্মতি পাওয়া যাচ্ছিল মানুষের কাছ থেকে। অলি আঙ্কেল নমিনেশন পেয়েছেন এটা আমাদের বাড়ির সবার জন্যে সৌভাগ্যের কথা। উনার পাশ ফেলের সাথে আমাদের গোষ্ঠীগত ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠারও একটা সম্ভাবনা জড়িয়ে আছে। বোকা ক্ষেপা জগলু কাকা এইসব বুঝেন না, মাঝখান থেকে তিনিই এখন কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। জগলু চাচা মধ্য বয়সী। কিন্তু চিরকুমার। কিছুটা দার্শনিক প্রকৃতির মানুষ। ঈদ পার্বণেও নামাজ পড়েন না। নিয়মিত পত্রিকা পড়েন। দেশ নিয়ে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভাবাভাবি করেন। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষে ট্যা ট্যা সহ্য করতে পারবেন না বলে কখনও ভোট দিতে যান না। সেই তিনিই কি-না এখন করবেন নির্বাচন? এটা এক রকম পরিহাসের মত। যেই শুনে মুখ টিপে হাসে। আমরাও প্রথমে হেসেছি। কিন্তু বোকা মানুষ শত্রু হলে যা হয়, নিজের নাক কেটে ইনি অন্যের যাত্রা বন্ধের উদ্যোগ করছেন।

মাস খানেক আগে আমাদের জেলা শহর থেকে যতগুলি স্থানীয় পত্রিকা বের হয় সব কটার সম্পাদকবর্গকে দাওয়াত করে খাইয়েছেন। দরাজ কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, আমাদের দেশে সরকারি এবং বিরোধী দল আসলে একই রকম ভাইরাসে আক্রান্ত…। এরা শিক্ষার কথা বলে। সংস্কারের কথা বলে । নারী অধিকার, কুলি মজুরের অধিকার নিয়ে বক্তৃতা ছাড়ে কিন্তু কখনও না-কি নিজেদের সংস্কারের কথা বলে না। সাংবাদিক সম্প্রদায় জানতে চাইল,‘আপনি কোন ধরনের সংস্কারের কথা বলছেন?’
তিনি কোন উত্তর না দিয়ে মৃদু হাসলেন। তারা আবার প্রশ্ন করল। তিনি বললেন,‘বেশি না,একটা!’ সবাই বলল,‘কী?’
তিনি বললেন,‘আমরা সব দিকেই কিছুটা এগিয়েছি। এখনও উত্তরণের পথেই আছি শুধু।’
‘শুধু কী?’

তিনি সরাসরি তার উত্তর না দিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতার অবতারণা করলেন। যা কিছু ভালো গ্রহণ করতে দোষ কী? আমাদের আইন হচ্ছে বৃটিশ আইনের অনুকরণে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়েছি পাশ্চাত্য সভ্যতার থেকে। শিক্ষার কারিকুলাম, নারী পুরুষের সম্পত্তি ও কর্মের অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রেরণায়। এইগুলি সরকারি দলের নেতৃত্বেই হচ্ছে। যারা করছেন তারা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞ। কিন্তু এই বিজ্ঞতা নিজেদের জন্যে প্রয়োগ করছেন না কেন? তিনি সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন। ভোট চেয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদি নির্বাচনে পাশ করেন তবে পার্লামেন্টে আসীন সকল মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি উদাত্ত কণ্ঠে তার বিপ্লবী দাবিটি পেশ করবেন।

সপ্তাহিক ‘সুবার্তা’র সম্পাদক কায়েস ভাই অধৈর্য হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘দয়া করে বললেন আপনার বিখ্যাত দাবিটি কী?’
জগলু চাচা বললেন,‘দাবি অনেক। তার মধ্যে প্রথমটা হচ্ছে, কেউ দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে দাঁড়াতে পারবেন না!’
‘দ্বিতীয়টা?’
‘দ্বিতীয়টার কথা পরে হবে মিয়া! কথা বলি, কথার গুরুত্ব বুঝতে শেখ। দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হতে পারবেন না এর মানে কি বুঝতে পারছ?’
য়েস ভাই বললেন,‘কেন পারব না?’
‘পারলে আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করতে না! শুধু এই একটা কথা বলার জন্যেই আজকে তোমাদের সবাইকে এখানে নিমন্ত্র্রণ করা। যদি সম্ভব হয় কথাটা একটু নেড়েচেড়ে দেখো। লেখালেখির মাধ্যমে আরো অধিক যুক্তিবদ্ধ করার চেষ্টা করো।’
কায়েস ভাই বয়সে আমার থেকে কিছু বড় হলেও স্বভাবে আমার বন্ধুর মত। তিনি আমাকে বললেন, ‘বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এই হল একটা সমস্যা। কোন একটা ধারণা একবার মনে গেঁথে গেলে এটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করে, মনে করে জগতে আর কেউ বুঝি তাদের মত ভাবতে পারে না! দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী পদে দাঁড়াতে পারবেন না, এটা বলার জন্যে এত আয়োজন?’
আমি বললাম,‘তুমি কি আশা করেছিলে তিনি আমেরিকা আক্রমণের ঘোষণা দেবেন?’
‘না তা নয়।’ তিনি একটু বিভ্রান্তের মত হাসলেন। তারপর বললেন,‘কথাটা অবশ্যি এক দিক থেকে আরেমিকা আক্রমণের চাইতেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদি আমরা সবাই এটাকে হেডলাইন হিসেবে তুলে ধরি ! আর যারা জাতীয় পত্রিকার সাথে যুক্ত…’
জাতীয় পত্রিকা পর্যন্ত যেতে হয় নি । জেলা শহর থেকে প্রকাশিত কিছু দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজের কল্যাণেই খবরটা বাজারে উঠে গেছে। ফেরিঅলা রিকশাঅলা থেকে শুরু করে স্কুলমাস্টার জাতীয় নিরীহ বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটা বেশে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে। তাদের একটা অংশ আবার নিজ খরচায় পোস্টার ব্যানার সাজিয়ে জগলুচাচার পক্ষে প্রচারণাও চালাচ্ছে। তাদের মনে উৎসবের আমেজ। এখনও বুঝতে পারছে না কী রকম ভয়াবহ আগুন নিয়ে খেলতে বসেছে। এটার মূলে যদি জগলুচাচা না হয়ে অন্য কেউ থাকতো,মা কালীর দিব্যি, এতদিনে লাশ পড়ে যেত কয়েকটা। আমরাই ফেলতাম।

নরম বিছানা। বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে শুয়ে অঙ্ক করছে রেবতি। মুখে আবার গুনগুন গানের শব্দ। বাহিরে পড়ন্ত বিকেল। কাক পক্ষির ডাকাডাকি চলছে। অনেক দূরে বিলের ধারে একটা লাল গাই, বাছুর নিয়ে ঘাস খাচ্ছে। হঠাৎ জানালা দিয়ে একটু সবুজের গন্ধমাখা হাওয়া এল। তাতেই আমার মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম জগলু চাচা ঘরে নেই। আছি কেবল আমি আর রেবতি। রেবতির বয়স তেরো। এই বয়সেই… না, থাক। এখন ফালতু চিন্তার সময় নয়। কাজের কথা বলি। কথা হচ্ছে, আমাদের গোষ্ঠীটা আর আগের মত অখণ্ড নেই। নানা কারণে ভাগ বিভাজন হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে নেতা হয়েছে। কেউ কাউকে মানে না, ছেলে বাবার কথা শোনে না। জগলু চাচারা আমাদের পুরনো আত্মীয় হলেও জমিজমা নিয়ে বিরোধ বিবাদের কারণে সম্পর্কে চির ধরে গেছে। বাবা কাকারা ওদের সাথে কথা বলবে না। আমি ছেলেবেলা থেকেই জগলু চাচাকে বিশেষ পছন্দ করতাম। তার কাছ থেকে গল্প কবিতার বই নিয়ে পড়তাম। তাই ভেবেছিলাম, আলাপসালাপ করে তাকে কিছু একটা বুঝাতে পারব। কিন্তু সে আশায় গুঁড়েবালি। উনার এখন যে মেজাজ, আমাকে তো পাত্তাই দিচ্ছেন না। এই যে এতক্ষণ ধরে ঘরে বসে আছি, সেধে একটা কথা পর্যন্ত বলছেন না! শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়েই আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন,‘চলে যাচ্ছ নাকি?’
‘জি।’
‘দাঁড়াও, তোমাকে একটা জিনিস দেখাচ্ছি।’ তিনি একবার রেবতির দিকে তাকালেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন,‘আচ্ছা, আসো আমার সাথে, একটু আলগা ঘরে গিয়ে বসি।’

ছোট্ট আঙিনা পেরিয়ে দখিন দিকে বাঁশঝাড়ের পাশেই তার ঘর। তিনি চাবি লাগিয়ে তালা খুললেন। আমি তার পিছু পিছু ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম। এই ঘরে আজই  প্রথম আসা নয়। আগেই বলেছি, এক সময় আমি ফালতু সময় কাটানোর জন্যে অনেক গল্প উপন্যাসের বই পড়তাম। তখন বইপত্র নেবার জন্যে এখানে প্রায় রোজই আসা হত। আসার আরেকটা কারণ ছিল, রেবতির বড় বোন শাপলা। সেবার আমি তার প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম। প্রথম প্রথম প্রেমে আবেগে নাকানিচুবানি খেতে খেতে অনেকগুলি কবিতাও লিখা হয়েছিল। শালা, মনে পড়লে হাসি পায়! কী হাঁদারাম গাঁধাই না আমি ছিলাম তখন। শাপলা ছিল বয়সে আমার চেয়ে কয়েক মাসের বড়। সেই জন্যে ছোটবেলা থেকেই ওকে আপু বলে ডেকে এসেছি। যখন ভালবাসাবাসি হলো তখনও সবার সামনে স্বচ্ছ থাকার জন্যে আপু শব্দটা ব্যবহার করতাম। ভেতরে বাহিরে তখন অবশ্যি এমনিতেই আমি খুব স্বচ্ছ ছিলাম। নয়ত কতদিন আমি আর শাপলা একাকী ওর রুমে বসে গল্প করেছি। কোনদিন একটা চুমো পর্যন্ত খাওয়ার ইচ্ছে হয় নি। কিন্তু আজ  যদি কেবল একবার ঘণ্টা খানিকের জন্যে রেবতিকে- ওউমঃ নাহ, দূর! আমি আসলেই অনেক খারাপ হয়ে গেছি। ‘এই যে, এইটা পড়ে দেখ তো কেমন লাগে!’ জগলু চাচা একটা ভাঁজ করা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন আমাকে। তিনি গিয়ে বিশাল দক্ষিণ মুখী জানালা খোলে তার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। আমি বসলাম বিছনার ওপর। ভাঁজ খুলে চিঠিখানা পড়লাম। এটা একটা সতর্কবাণী! লিখা হয়েছে, জগলু মিয়া সাবধান। অপপ্রচারণা বন্ধ কর অথবা মৃত্যুর জন্যে…।

চিঠির কোণার দিকে আবার পিন দিয়ে একফালি সাদা কাপড় লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। ছোট করে লেখা, তোমার শেষ কৃত্যের জন্যে দেখ তো কাপড়টা পছন্দ হয় কি-না?
‘এটা নিশ্চই তোমাদের কাজ নয়?’ আমি ফিরে তাকালাম জগলু চাচার নির্বিকার মুখের দিকে। কী বলব হঠাৎ ভেবে পেলাম না। জগলু চাচা হাসলেন। বললেন,‘গত রাত্রে ওদেরই একজন আবার ফোন করেছিল।’ ‘কী বলল?’
‘কী বলতে পারে বুঝ না?’
আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন,‘এটা এক রকম হাস্যকরই বলা চলে। কিন্তু আমার সাবধান হওয়া উচিত। কী বলো?’
‘জি।’
‘সময়ে জন্তু জানোয়ারকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু মানুষকে আজকাল বিশ্বাস করা কঠিন। হুট করে একটা ছুরি চালিয়ে ভুড়িটা ফাসিয়ে দিল- বলা তো যায় না কিছু!’
‘আরে না, আপনাকে মারতে যাবে কে?’ জগলু চাচা কোন কথা না বলে বাহিরে তাকালেন। বিকেল ফুরিয়ে আসছে। পাড়ার ছেলেরা ব্যাট-বল হাতে নিয়ে মাঠে নামছে। নাটু মন্ডলদের পুকুরে পাম্প বসিয়ে জল শুকানো হচ্ছে। মাছটাছ ধরা হবে হয়ত। পুকুর পাড়ে অনেক মেয়েছেলের ভিড়। নান্টু মন্ডল উদলা গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার বিশাল ভুড়িতে বিকেলের রোদ পড়ে চকচক করছে।

জগলু কাকা আমার দিকে ফিরে গলা খাঁকারি দিলেন। বললেন, ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়েছিলাম আমি! কোন দরকার নেই বাবা। তোমার তালুই মশাইকে ফোন করে বলে দিও আমি বসে গেছি।’
আমি বললাম,‘আশ্চর্য আপনি নিজেকে এত একা ভাবছেন কেন? নির্বাচনের কথা বাদ দিন। আপনাকে কে-না-কে মৃত্যুর হুমকি দিয়ে যাবে আর আমরা তাকে এমনিতে ছেড়ে দেব?’
‘তুমি এখনও বুঝতে পার নি। এটা কোন গোষ্ঠীগত বিবাদ নয়, অনেক বড় কিছু। ফোনে যা বলল তাতে মনে হয় কথাটা কোন আতেল মন্ত্রী-মিনিস্টারের কানেও পযর্ন্ত পেঁছে গেছে।’
‘তাতে কী?’
‘কিছুই না। নির্বাচন করার ইচ্ছে আমারও নেই। শুধু ওই একটা কথা মানুষের মুখে তুলে দেবার জন্যে এত আয়োজন।’ তিনি হাসলেন। বললেন, ‘অনেক অনেক আগে, প্রাচীন কালে যারা রাজা বাদশা হত মানুষের আনুগত্য লাভের জন্যে তারা কী করত জান?’
‘কী?’
‘নিজেকে দেবতাদের বংশধর বলে দাবি করত। মানুষের ধর্মকর্মের সাথে নাম জড়িয়ে পূজা নিত। মধ্যযুগে ধর্মান্ধতা কিছুটা হ্রাস পেল। তখন তারা ধরল অন্য রাস্তা। সুবিশাল অট্টালিকা, হেরেম, হিরা জহরত গায়ে লাগিয়ে, তীব্র অর্থ গরিমা, শান-শওকত  দেখিয়ে সাধারণ প্রজাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিত। মানুষের ভেতর এই বোধ তৈরি করে দিত যে, তোরা ইতর আমরা মহৎ। আসলে তো সব করত প্রজাদের ঘাম ঝরানো শ্রম চুষেই, না?’
‘জি।’

তিনি বললেন,‘মানুষের হ্যাংলামি দেখে দুঃখ হয়,জান? এত কাল চলে গেল এখনও আমরা এইটুকুই বুঝতে পারলাম না যে- ওসব রাজা বাদশা রাষ্ট্র নায়ক সব খড়ের পুতুল। এই দেশ, এই যে এত এত মানুষ, এই নদী জল, বাতাস, কাকপক্ষি, জ্যোৎস্না রাত, এরা কখনও কারো অধীন কিংবা গোলাম ছিল না, হতে পারে না। আসলে শাসকের জাতটাই আলাদা। যখন যেই ক্ষমতায় আসে আগের জনের নিন্দা করে বলে আমি ওমুকের দুঃশাসন থেকে তোমাদের মুক্তি দিলাম অতএব আমাকে নমঃনমঃ কর! আরে বেটা তোর সাত পুরুষের ভাগ্য যে রাজাসনে বসতে পেরেছিস, কোথায় তুই নমঃনমঃ করবি।’
আমি হাসলাম। বললাম,‘এখন কিন্তু তাই করে!’
‘কী করে?’
‘ওই যে আপনি বললেন?’
‘নমঃনমঃ?’
আমি বললাম,‘প্রাচীন যুগে মানুষ ছিল মূর্খসুর্ক তাই রাজা বাদশাগণ যা ইচ্ছে তাই বলে তাদের ওপর প্রভাব খাটাত।’
‘এখন খাটায় না?’
‘না মনে হয়। কিছুটা ভাব-গরিমা দেখালেও মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সব সময় মানুষের কথাই বলে।’ ‘কেন বলে?’
আমি তৎক্ষণাত তার কোন উত্তর দিতে পারলাম না। জগলু চাচা বললেন,‘মানুষের কথা না বলে উপায় নেই!’
আমি হাসি মুখে মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন, ‘পৃথিবীতে এখন এক আশ্চর্য সুসময় এসেছে বুঝলে! দেশে দেশে প্লেটর দার্শনিক রাজা- আল ফারাবীর রসূলে ইমাম, মার্কসের সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ।আর আমরা কিনা পড়ে আছি মিথ্যে বংশ গৌরব, অলীক আভিজাত্য আর অহেতুক উত্তরাধিকারের দায় মেটাতে! দেশে যে এত এত বুদ্ধিজীবী তারা দেখি টিভিতে খবরের কাগজে কত কথা বলেন, এইটা নিয়ে কেউ কখনও কিছু বলেন না কেন?’
আমি ঠোঁট উল্টে না জানার ভঙ্গি করলাম। জগলু চাচা হঠাৎ সশব্দে হেসে উঠলেন। বললেন,‘আমিও জানি না! বেলা পড়ে আসছে, আমাকে একটু উঠতে হবে।’

আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। জগলু চাচা দরজায় তালা দিতে দিতে বললেন,‘ছেলেগুলি আসলে খুব বোকা।’
‘কারা?’
‘যারা চিঠি দিল, ফোন করল। ওদের বুঝা উচিত ছিল আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন মানুষের বিরুদ্ধে কিছু বলি নি। এটা হচ্ছে একটা ভেজাল প্রথার বিরুদ্ধে কিছু বলা। আরে ভাই যেই লোকটা মন্দিরে পৌরোহিত্য করে সে দিনে বাধ্য হয়ে হলেও তো দশবার ভগবানের নাম নেয়। ইস্কুল ঘরে কখনও বেশ্যা নাচে না, শিক্ষক আর ছাত্রদেরই উৎসব বসে। রাষ্ট্র যন্ত্রটাকে যদি আরেকটু উদার, আরেকটু সাদাসিধা করা যেত তবে দেখতে সিংহাসন নিয়ে এত কাড়াকাড়ি হত না। যদি প্রতিটা দল থেকে যোগ্যতম মানুষটিকে রাজাসনে বসার পরিবেশ করে দেয়া যেত।’
জগলু চাচার সব কথা অবশ্যি আমার কান দিয়ে ঢোকে নি। সবচেয়ে ভাল খবর হচ্ছে, নির্বাচনটা তিনি করবেন না। এতে অলি অ্যাঙ্কেলের যে কয়েক হাজার ভোট মার যাবার আশঙ্কা ছিল তা থেকে মুক্ত হওয়া গেল। সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে বসে চা-বিস্কুট খেতে খেতে আমি এইসবই বিস্তারিত ভেঙে বর্ণনা করলাম।
জসিম ভাই তখন ছোট মামার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারিক বলল,‘ওষধে ধরেছে তাহলে!’

আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম ওদের দিকে। ঘটনা বুঝতে দেরি হল না। চিঠি, বেনামে ফোন, সব তাহলে ওদেরই কীর্তি? আমাকে পাঠানো হয়েছিল প্রতিক্রিয়া দেখে আসার জন্যে! মে মাসের শেষাশেষি নির্বাচন হল। অলি অ্যাঙ্কেল বিপুল ভোটে পাশ করলেন। পাশের কথা শুনে আমাদের সে কী আনন্দ। অলি অ্যাঙ্কেল লোক ভাল। ইয়ং জেনারেশনের গুরুত্ব বুঝেন। নদীতে তখন নতুন পানি। তিনি আমাদের জন্যে বিশাল একটা দুইতলা লঞ্চ ভাড়া করে দিয়ে বললেন, ‘যাও ঘুরে এসো যেখান থেকে খুশি। আমরা ভাই-ব্রাদার বন্ধুবান্ধব পঞ্চশ ষাটজন মিলে দক্ষিণে সমুদ্র অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। দশ দিনের সফর। অনেক খাওয়া দাওয়া, হৈ-হল্লা, ফুর্তি আমোদ হলো । পথে এক জায়গায় আমরা চার পাঁচজন যাত্রা বিরতি দিয়ে কয়েকটা বাজারি মেয়েকেও নেড়ে চেড়ে দেখে এলাম। আমি নিলাম সব চেয়ে কচিটা। রেবতির মতই বয়স। তবে খুব প্রফেশনাল। ভালই খাটিয়েছে আমাকে। মজাও দিয়েছে সেই রকম। সেদিন হোস্টেলের নরম বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি কেবল একটা কথাই ভাবছিলাম। জগলু কাকাটা খুব বোকা এবং নিরস (আসলেই নিরস, নয়ত বিয়ে শাদী না করে একটা মানুষ থাকতে পারে কী করে?)। দুই তিন মাস নির্বাচর্নী কর্মী হিসেবে কাজ করেই আমরা যে ‘ভোজ্যং ভোগ্যং আনন্দমং’ পেয়েছি, নিজে নির্বাচনে পাশ করতে পারলে না জানি কেমন লাগবে! সেইসব আরামের কথা চিন্তা না করে তিনি আছের কেউটেবাজিতে। ঠিক করলাম, ভবিষ্যতে রাজনীতিই করব। বাবার তো টাকা পয়সার অভাব নেই। এমপি মিনিস্টার একটা কিছু চেষ্টা করলে হয়ে যেতে পারি। মনে মনে একটা খসড়া তৈরি করে ফেললাম, যদি আমি কোনদিন কোনভাবে কোন একটা দেশের রাজা হয়েই যাই তবে কী কী করব।

এক, ছলে বলে কৌশলে নিজের ক্ষমতা সারা জীবনের জন্যে স্থায়ী করে নেব এবং বিরোধী দলের সব কজনকে হাজতে ঢুকাব। দুই, একটা হেরেম থাকবে। সেখানে ঐশ্বরিয়ার মত সুন্দর সুন্দর কিছু রাধিকা থাকবে। তিন, সব সময় কোট-টাই পড়ে ফিটফাট হয়ে থাকব। পাঞ্জাবি পরব না। পাঞ্জাবিতে আমাকে ভাল লাগে না। চার, নাহ, আর বেশি কিছু করা যাবে না। এটা তো মধ্য যুগ নয় যে… তাছাড়া একটু আশঙ্কাতে আছি, আমাদের সময় আসতে আসতে দেশের মন্ত্রী মিনিস্টারদের (মর্যাদা, না মর্যাদা নয়, ক্ষমতা!) ক্ষমতা যদি নামতে নামতে কেরানি কিংবা ইস্কুল মাস্টারদের লেভেলে নেমে যায়? বলা তো যায় না, যেভাবে নামছে!

লেখক : গল্পকার, ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৯, কিশোরগঞ্জ।

আরও খবর

(Visited 1 times, 1 visits today)

Editor : Rahmatullah Bin Habib


55/B, Purana Palton, Dhaka-1000


Mobile : 01734 255166 & 01785 809246 । Email : nobosongbad@gmail.com


copyright @nobosongbad.com


যদি আমি রাজা হই