পাহাড়ের কান্না

প্রকৃতি হচ্ছে এমন এক ভাণ্ডার, যেখানে সব প্রাণীর সমান অধিকার রয়েছে। সব প্রাণী প্রকৃতির সুবিধাভোগী। কিন্তু মানুষের অতি লোভী কার্যকলাপের ফলে প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির কারণে কোথাও খরা, অনাবৃষ্টি, মরুময়তায় মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল উৎপাদন। কোথাও অতিবৃষ্টি, বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত ও ফসলহানি। আবার দেখা যায়, বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি নেই। কিন্তু গ্রীষ্মে বা শরতে অনেক বৃষ্টি।

চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় ১৩ জুন রাতে পাহাড় ধসের ঘটনায় প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হয়েছে। মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক এ ঘটনা পুরো দেশবাসীকে শোকাহত করেছে। পাহাড় প্রকৃতির একটি উপাদান। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট অনেক কারণে পাহাড় ধস হতে পারে। এবারের ঘটনায় অতিবৃষ্টিকে (প্রকৃতি প্রদত্ত কারণকে) দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু অতিবৃষ্টি কেন ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে, সে আলোচনা হচ্ছে না।

মূলত, ঘরবাড়ি, রাস্তাসহ আবাসিক, বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করতে পাহাড় কাটা এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধণ ইত্যাদি কারণে অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধস হয়েছে। পাহাড় যদি কাটা না হতো, পাহাড়ে যদি পর্যাপ্ত স্থানীয় গাছ থাকত, তবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ভূমিধস ও এর ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

পাহাড় কেটে খাড়াভাবে ঘরবাড়ি বা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত আবাসনের কারণে এবারের ধসে মানুষের মৃত্যু বেড়েছে। পাহাড় কাটা, সংরক্ষিত বনের গাছ কাটা, জলাশয় দূষণ ও ভরাট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ! কিন্তু এ কথা আইনের গেজেটেই সীমাবদ্ধ, এর বাস্তবায়ন দেখা বিরল সৌভাগ্য।

গণমাধ্যমে পাহাড় কাটার অনেক ছবি ছাপা হয়েছে। কত জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তার কোন তথ্য জানা যায় না। যাদের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার অভিযোগ শোনা যায়, রাজনৈতিকভাবে তারা অনেক ক্ষমতাবান। ফলে দৃষ্টান্তমূলক ও দৃশ্যমান কোন সাজা দেয়া হয় না।

অনেকে মনে করেন, সত্তর দশকের শেষদিকে ও আশির দশকে পাহাড়ে বাঙালিদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের শুরু। ১৪ জুন মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফোরাম অব বাংলাদেশ-এর এক সংবাদ সম্মেলনেও এমন অভিযোগ করা হয়েছে। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই পাহাড়ে বাঙালিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

পুনর্বাসিত বাঙালিদের পাহাড়ের পরিবেশ পর্যাপ্ত সম্পর্কে ধারণা ছিল না, থাকার কথাও না। বাঙালিদের আবাসন ও যোগাযোগের জন্য পাহাড় ও পাহাড়ের গাছ কাটতে হয়েছে। পাশাপাশি রান্না ও তামাক পাতা চুল্লীতে শুকানোর জন্য জ্বালানি হিসাবে ব্যবহারের জন্য নির্বিচারে পাহাড়ি গাছ কাটা হয়েছে।

পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ের পরিবেশ ধ্বংসের একটা বড় কারণ তামাক চাষ। ধূর্ত তামাক কোম্পানিগুলোর প্রত্যক্ষ মদদে, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে দরিদ্র কৃষকদের লাভবান হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পার্বত্য এলাকায় গত এক যুগে তামাক চাষের এলাকা দ্বিগুণ বিস্তৃত করা হয়েছে।

তামাক চাষের জায়গা প্রস্তুত ও কাঁচা তামাক পাতা চুল্লীতে শুকানোর জন্য লাখ লাখ গাছ কাটতে হয়েছে। প্রতি কেজি তামাক পাতা চুল্লির মধ্যে আগুনের তাপে শুকাতে ২৫ কেজি কাঠ পোড়াতে হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর যত গাছ কাটতে হয়, তার ৩০ভাগ তামাক পাতা শুকাতে ব্যবহার হয়।

কিন্তু পার্বত্য এলাকায় ৮০ভাগেরও বেশি গাছ তামাক চুল্লীতে ব্যবহার হয়। দায় এড়াতে তামাক কোম্পানিগুলো বৃক্ষরোপণের নামে ইপিলইপিল, ইউক্যালিপটাস, একাশিয়া ইত্যাদি বিদেশী গাছ লাগায়। দ্রুত বাড়ন্ত এসব গাছের শেকড় পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত নয়।

উপরন্তু, এসব গাছ আমাদের জীববৈচিত্র্যর জন্য হুমকি। তামাক পাতা যখন চুল্লীতে আগুনের সাহায্যে তাপ দিয়ে শুকানো হয়, তখন ঐ এলাকার বায়ুদূষণ ঘটে। যা হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ইত্যাদি রোগবালাই বৃদ্ধি করে।

কয়েক বছর তামাক চাষ করার কারণে উর্বরতা হারায় কৃষি জমি। এছাড়া কৃষি জমিতে তামাক চাষ করায় খাদ্য উৎপাদন কমে গেছে। তামাক চাষ আশেপাশে অন্যান্য ফসলী জমিরও ক্ষতি করে। তামাক পাতার কারণে এমন পোকা আসে যা পাশের জমির ফসলের ক্ষতি করে।

উন্নয়নে বিকল্প নীতি গবেষণা (উবিনীগ) এর গবেষণায় বলা হয়েছে, জমি তৈরি, বীজ বপন, পরিচর্যা, পাতা তোলা ও তামাক গাছের গোড়া তোলা ইত্যাদি কারণে ৮ মাসের বেশি সময় লাগে। এতে ৩টি মৌসুমের ফসলের ক্ষতি হয়। শুধু বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় ৫৩৯৯ একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

এসব জমিতে ২১ ধরনের খাদ্যশস্য চাষ করা যায় এবং যার অর্থমূল্য ১১ কোটি টাকা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এসব খাদ্যশস্য উৎপাদনে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতির ক্ষতি হয় না।

পার্বত্য এলাকার মানুষ প্রাকৃতিক পানিনির্ভর। সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ নদী ও জলাশয়ের ঢালু উর্বর জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক নদী-জলাশয়ের পানি দূষণ করছে। ফলে মৎস্য সম্পদসহ জলজ প্রাণীর ক্ষতি এবং এ পানি ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। বিশেষ করে মাছের ডিম পাড়ার সময়ে তামাকের কীটনাশক পানির সঙ্গে মেশার ফলে মাছের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ক্রমশ এ এলাকায় মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

পার্বত্য এলাকায় কৃষি জমির পরিমাণ খুব কম। কিন্তু মানুষ কম হওয়ায় এখানে কখনও খাদ্য সংকট ছিল না। তামাক চাষের আগ্রাসনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে। ২০১৫ সালে প্রায় দুর্ভিক্ষের মত অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেজন্য সরকারকে বিশেষ ত্রান সহায়তা পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।

মানুষের অনিয়ন্ত্রিত লোভের কারণে প্রকৃতি-পরিবেশ, পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল, নদীনালা, খালবিল, পুকুর, হাওরবাওড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিভিন্নরকম জলাশয় মারাত্মকভাবে দখল দূষণের শিকার। দিনের পর দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা ও ক্ষেত্রবিশেষে যোগসাজশে লোভী মানুষগুলো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পাহাড়, জলাশয় দখল করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানও এসব ভরাট করে রাস্তা তৈরি কিংবা ভবন নির্মাণ করেছে। তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রকৃতির চাইতে অবকাঠামো গুরুত্ব পাচ্ছে।

সবকিছুতে বাণিজ্যিক চিন্তার মত দৈন্যতা মানুষকে গ্রাস করছে। গণমাধ্যমে দেখলাম, গত দশ বছরে গড়ে প্রতিবছরই পাহাড় ধস হয়েছে, মানুষ মরেছে। কিন্তু দায়ীদের চিহ্নিত ও সাজা প্রদানের খবর পাওয়া যায় না। যখনই এ ধরনের কোন দূর্ঘটনা ঘটে, তখনই তাদের অর্থ সাহায্য দিয়ে দোষীদের আড়াল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। দূর্ঘটনার মূল কারণ খুব কমই জানা যায়।

তাছাড়া যেখানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত, সেখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেয়াটাও দায়িত্বে অবহেলা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না।

সরকার পাহাড়ের সঙ্কট দূর করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড করেছে। কিন্তু এ বোর্ডের ক্ষমতা কতটুকু? তাদের ওয়েব সাইটে গিয়ে বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য দেখলাম। কিন্তু এর কোনটিই তাদের এখতিয়ারে নেই।

যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে সড়ক ও সেতু বিভাগ, শিক্ষার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান, কৃষি কাজের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর ও মৎস্য উন্নয়ন বোর্ড পার্বত্য এলাকায় বিস্তৃত জলাশয়গুলো মৎস্য সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড সেখানকার পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করবে।

ক্রীড়া ও সংস্কৃতিক বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সম্পর্ক কিরূপ এ সম্পর্কিত কোন তথ্য ওয়েবসাইটে নেই।

বন অধিদপ্তর বনাঞ্চল রক্ষা করবে, কিন্তু পার্বত্য এলাকার সংরক্ষিত বনই অরক্ষিত। পাহাড় কাটা বা অন্যান্য দূষণ প্রতিরোধ পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ বলেই প্রতীয়মান। বস্ত্র অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোওসহ সরকারি আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করছে।

কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। তদুপরি, এসব কোন প্রতিষ্ঠানই পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আজ্ঞাবহ নয়।

পার্বত্য এলাকা দেশেরই একটি বিশেষ এলাকা, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদের ভাণ্ডার। কিন্তু মানুষের লোভী ও অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীন উন্নয়নে পার্বত্য এলাকা নানা সঙ্কটে জরাজীর্ণ। বিদ্যমান সমস্যা উত্তরণ এবং ভবিষ্যত দুর্যোগ মোকাবেলায় এখনই সতর্ক হতে হবে।

আর কোন পাহাড় যেন কাটা না হয়, বনাঞ্চলের নিজস্ব কোন গাছ যেন কাটা না হয়, সামাজিক বনায়নের নামে যেন কোনভাবেই বিদেশী গাছ লাগানো না হয়, প্রাথমিকভাবে এসব নিশ্চিত করতে হবে। আশা করি, সংশ্লিষ্টরা সেদিকেই মনোনিবেশ করবেন।

আমিনুল ইসলাম সুজন : সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন; নির্বাহী সম্পাদক, সমস্বর, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট।
aisujon@yahoo.com

(Visited 1 times, 1 visits today)

Editor : Rahmatullah Bin Habib


55/B, Purana Palton, Dhaka-1000


Mobile : 01734 255166 & 01785 809246 । Email : nobosongbad@gmail.com


copyright @nobosongbad.com


পাহাড়ের কান্না