একটি খাঁচা ও কাকাতুয়ার গল্প

 

অাশানুর রহমান খোকন :  অামার ঘুম ভেঙে গেলো অথবা জ্ঞান ফিরে এলো  কিন্তু চোখ খুলতে পারছি না। চোখে প্রচন্ড ব্যথা এবং ব্যথা মাথাতেও। বুঝার চেষ্টা করছি কোথায় শুয়ে অাছি। পিঠের নীচটা বেশ শক্ত, মোটেই অারামদায়ক নয়। একটু নাড়াচড়া করতেই খসখস অাওয়াজ হলো। বামহাত দিয়ে বুঝার চেষ্টা করতেই বুঝলাম, হাতেও প্রচন্ড ব্যথা, ভালভাবে হাতটি নাড়াতে পারছি না। পা’দুটো নাড়াতে গিয়ে দেখি পা দু’টো পাথরের মতো ভারী। অনেক কষ্টে একটি চোখ একটু খুলতেই মনে হলো চারিদিকে অন্ধকার। চোখ বন্ধ করে ফেললাম। অাবার চোখ খুললাম। তখনও অন্ধকার, সবকিছু ঝাপসা লাগছে। কাছের দু/একটি জিনিষ দেখতে চেষ্টা করলাম। ডানদিকে মাথাটা সামান্য কাত করতে দেখতে পেলাম ছোট ছোট গুল্মজাতীয় কিছু গাছ। অাশে পাশে শুকনো ঝরা পাতা। বামদিকেও একই অবস্থা। ততক্ষণে অারেকটি চোখ খুলতে পারলাম। চোখ গেলো সোজা উপরে। মনে হলো একটা বড় গাছের নীচে শুয়ে অাছি। পাতার ফাঁক দিয়ে যতটা দেখা যায় তাতে মনে হলো, কিছুটা অালো ফুঁটতে শুরু করেছে। ধারণা করলাম ভোর হচ্ছে। মনে করার চেষ্টা করলাম অামি এখানে কেন? মাথাটা এলোমেলো লাগছে। মনে হলো চোখের কাছ থেকে তরল কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে। অনেক কষ্টে হাতটি দিয়ে সেখানে স্পর্শ করতেই মনে হলো তরল চ্যাটচ্যাটে কিছু একটা হাতে লেগে গেলো। অাঙুলের ডগায় লেগে যাওয়া তরল জিনিষটি চোখের কাছে অানতেই দেখতে পেলাম, প্রায় শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। একটু একটু মনে পড়ছে, ওরা অামাকে যখন ধরে চোখ বেঁধে গাড়ীতে তোলে তখন কেউ কেউ অামার পিঠে, চোখে মুখে বেদম প্রহার করছিল। কতক্ষণ গাড়ীটি চলার পর কোন একটি জায়গায় তারা গাড়ীটি থামিয়ে অামাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়ী থেকে নামায়, তখনও কেউ কেউ অামাকে কিল-ঘুঁষি মারছিল। অামাকে টানতে টানতে কোথাও নেয়া হচ্ছিল। অামার হাতও বাঁধা ছিল ফলে নিজেকে অাত্মরক্ষার কোন উপায়ই ছিল না। প্রথমে ব্যথায়, কষ্টে মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ হচ্ছিল, কিন্তু সেই শব্দটুকুও তারা করতে দিতে চায়নি বলে অামার মুখে তারা একটি কাপড় গুঁজে দিয়েছিল। যতক্ষণ অামার হুঁশ ছিল, অামার মনে অাছে তারা অামাকে অনবরত মারছিল, একজন কিছু একটি দিয়ে অামার মুখের চোয়ালে বাড়ি দিলে মনে হয়েছিলো, অামার কয়েকটি দাঁত ভেঁঙে গেলো, তরল কিছু, রক্তই হবে মনে হয়, ফিনকি দিয়ে বের হয়ে গেলো। একজন অামার পুরুষাঙ্গে প্রচন্ড জোরে লাথি দিলো, তারপর অামার অার কিছু মনে নেই। তারা সবাই মিলে অামাকে একটি প্রশ্নই বার বার করছিল। অামি যতবারই বলেছি, অামি কিছু জানিনা, তারা ততই অামাকে প্রহার করছিল। প্রত্যেকের কন্ঠস্বর একই রকম লাগছিল অথবা এমনও হতে পারে একই ব্যক্তি বারবার সেই প্রশ্নটিই করছিল। অামার হাত বাঁধা ছিল, চোখও। অামি এখানে কিভাবে এলাম? হাত বা চোখ কে খুলে দিলো। নাকি অামি অজ্ঞান হয়ে যাবার পর মৃত ভেবে এখানে ফেলে গেছে? মাথার মধ্যে একই সাথে অনেক প্রশ্ন এসে ভিড় করলো, কিন্তু কোন কিছুই পরিস্কার করে ভাবতে পারছি না। চোখ ভারী হয়ে অাসছিল, শারিরীক অবসাদে অামার ঘুম পেয়ে গেলো।

অাবার যখন ঘুম ভাঙলো চোখ মেলতেই দেখি সূর্য প্রায় মাথার উপরে। চারিদিকে চোখ বুলালাম। অাশেপাশে ঝোঁপঝাড় অার গাছপালা ছাড়া কিছু চোখে পড়লো না। যে গাছের নীচে অামি শুয়ে সেটা বটগাছের মতো মনে হলো। হাত-পা-চোখ-মুখ ব্যথায় টনটন করছে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে, মনে হলো কেউ যেন হাতুড়ি পিটাচ্ছে। চারিপাশে তখনও নিঝুম ও শান্ত। হঠাৎ কে যেন মানুষের গলায় বলে উঠলো, ‘ঘুম ভাঙলো?’

অামি চমকে উঠে চারিদিকে তাকালাম। ভয়ও পেলাম। গত বেশ কিছুদিন ধরেই একটি প্রাণীকেই অামি ভয় পাচ্ছিলাম সেটা মানুষ। বিশেষ ধরণের মানুষ। যারা একই কথা কোরাসের মতো করে বলতো। এই নিঝুম জঙ্গলের ভিতর মানুষের গলা পেয়ে অামি তাই ভয়ে চমকে উঠেছি। কিন্তু কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না। নাকি মনের ভুল! নাকি শারিরিক অবসাদে অামার মতিভ্রম হলো? অাবার ভালভাবে চারিদিকটায় তাকালাম। না, কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না। ভাবলাম, এ অামার মনেরই ভুল। অাবার চোখটা বন্ধ করতে যাবো, এমন সময় অাবার মানুষের গলায় কে যেন বলে উঠলো, ‘ অারেকটু ঘুমাবে?’ চমকে উঠে অাবার এদিক-ওদিক তাকালাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। চোখ উপরের দিকে যেতেই দেখলাম গাছের ডালে একটি কাকাতুয়া বসে অাছে। অামি অবাক হয়ে যখন ভাবছি, এখানে কাকাতুয়াটা কিভাবে এলো, তখনি কাকাতুয়াটি অাবার কথা বলে উঠলো, ‘এখন কেমন বোধ করছো?’

কাকাতুয়া কথা বলে জানতাম, কিন্তু এরকম পরিস্কার মানুষের গলায় ঠিক মানুষের মতো করে প্রশ্ন করতে পারে সেটা ভাবা অামার স্বপ্নেরও অতীত। অামার মুখে প্রচন্ড ব্যথা, মুখের ভিতর ভেঙে যাওয়া দাঁতের টুকরোগুলো তখনও বোধ করি রয়ে গেছে। অামি একটু উঠে বসতে চেষ্টা করতেই মনে হলো অামার শরীরের সমস্ত হাঁড়গোড় ভেঙে গেলো। কিছুক্ষণ নিঃষাঢ় হয়ে পড়ে থাকলাম। বেশ কিছুটা পর, একটু বল পেয়ে অাবার উঠে বসতে চাইলাম। পারলাম না। অনেকটা হামাগুঁড়ি দিয়ে, অাস্তে অাস্তে গাছের শিঁকড় ধরে ধরে গাছের গোড়ায় পিঠটি ঠেকিয়ে নিজের শরীরের দিকে তাঁকিয়ে নিজেই চমকে উঠলাম। এমন সময় কাকাতুয়াটা গাছের ডাল থেকে নেমে অামার সামনাসামনি একটি শিকড়ের উপর এসে বসলো। অামার দিকে তাকিয়ে পরিস্কার গলায় জানতে চাইলো,

‘ ওরা তোমাকে মেরে এখানে ফেলে গেলো কেন? ওরাই বা কারা?’

অামার কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। প্রথমত: ভীষণ ক্ষুধা বোধ করছিলাম, শরীরের কয়েকটি স্থান থেকে তখনও অল্প অল্প রক্ত বের হচ্ছে। শরীর ভেঙে অাসছে। জীবনীশক্তিও যেন কমে অাসছে। তবু মনে হলো, এই জঙ্গলের ভিতর কোন সাহায্য পাবার তো অাশা নেই! হয়তো কিছুক্ষণবাদে মারা যাবো। মরার অাগে না হয় অারো কিছু কথা বলেই মরি। বললাম——

– ওরা পুলিশের লোক।

-তোমাকে এভাবে মেরে ফেলে গেলো কেন?

-অামাকে মৃত ভেবে।

-তোমাকে মারতে চেয়েছিল কেন?

-অামি মুক্তি চেয়েছিলাম। অামার ও অামাদের।

অামার কথা শুনে কাকাতুয়াটা অবিকল মানুষের গলায় হো হো করে হেসে উঠলো। অামার কথা শুনে হাসির কি কারণ অাছে বুঝতে না পেরে বোকার মতো চেয়ে থাকলাম। একবার মনে হলো, সবই মনে হয় অামার দূর্বল মনের কল্পনা। অামি কেন বোকার মতো কথা  বলছি।

কাকাতুয়াটি তখন বলে উঠলো, ‘ তোমরা মানুষরা নিজেদের অনেক জ্ঞানী ভাবো। তোমরা মুক্তি চাও, অথচ মুক্তির উপায় তোমাদের জানা নেই’।

অামি বললাম, ‘মানে? অার তুমিই বা কে? এত কথা তুমিই বা জানো কি করে?’

– জালাল উদ্দিন রুমির নাম শুনেছো?

-হ্যাঁ। পারস্যের দার্শনিক কবি।

-ঠিকই ধরেছো। অামাকে তিনিই বিখ্যাত করে গেছেন। অার তোমাদের সৈয়দ মুজতবা অালী ছিলেন না? সে তো বাঙালী পাঠকদের কাছে অামাকে রীতিমতো নায়ক করে তুলেছিল। অামি সেই কাকাতুয়া।

– বুঝতে পারছি না। হেঁয়ালি না করে পরিস্কার করে বলো না তুমি কে? তাছাড়া অামি বোধহয় বেশীক্ষণ টিকবো না। তাড়াতাড়ি বলে ফেলো তুমি কে?

– শোন তাহলে। অামি পারস্যের এক বণিকের পোষা কাকাতুয়া ছিলাম। তিনি অামাকে তোমাদের দেশ থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। অামি ভুলতেই বসেছিলাম অামি কে? একদিন ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি এদেশে অাসার অাগে সবার কাছে জানতে চাইলেন কে কী চায়। অামাকেও ভদ্রতা করে জিজ্ঞাসা করলে অামি বলেছিলাম- সেখানে অামার দেশী ভাই-বোনেরা অাছে। তুমি যদি সময় পাও এবং তাদের দেখা পাও তবে একটি কথার উত্তর জেনে এসো। অামি তাকে বলেছিলাম জেনে অাসতে যে পারস্য দেশে তাদের এক জ্ঞাতি ভাই খাঁচায় বন্দী হয়ে অাছে, তার মুক্তির কোন উপায় অাছে কিনা?

সওদাগর সব কাজ শেষে অামার কথাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ফেরার অাগের দিন একটি বাগানের পাশ দিয়ে যাবার সময় এক ঝাঁক কাকাতুয়াকে উড়ে যেতে দেখে সে চিৎকার করে অামার মুক্তির উপায় জানতে চেয়েছিল। কাকাতুয়ারা উড়ে যাচ্ছিল, যেন কেউ তার কথা শুনতে পায়নি। কিন্তু হঠাৎ করে ঝাঁকের ভিতর থেকে একটি কাকাতুয়া ঢপ করে মাটিতে পড়ে যায়। বণিক দেখে কাকাতুয়া মৃতপ্রায়। সে দু:খ পায় এবং ফিরে অাসে। ফিরে অাসার অনেক পরও সে অামাকে দেখতে অাসে না। অথচ খাঁচায় বন্দী অামি মুক্তির উপায় জানতে উন্মুখ। যেভাবেই হোক এই খাঁচা থেকে অামাকে  তখন মুক্ত হতেই হবে!

অামি তখন অারো নিস্তেজ হয়ে পড়ছি, অথচ কাকাতুয়াটি তখনও বলে চলেছে—-

– অামি বণিকের দেখা পাই না। সে অামাকে এড়িয়ে চলে। একদিন ভুল করে নে অামার ঘরে ঢুকে পড়ে।  অামি তাকে সালাম দিয়ে জানতে চাইলাম-সে অামার প্রশ্নটির উত্তর জেনে এসেছে কিনা। সে কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকে। হয়তো সেই ঘটনাটি অামাকে বলবে কিনা ভেবে ইতস্তত: করছিল। অামি জোরাজুরি করতে থাকি। অবশেষে সে অামাকে সব খুলে বলে। একটি কাকাতুয়ার পড়ে মরে যাবার কথাও বলে। তার কথা শেষ হবার সাথে সাথে খাঁচায় বসে থাকা অামি ঢপ করে খাঁচার ভিতরে পড়ে যায়, মৃতের মতোই। বণিক অারেক দফা দু:খ পায়, অামি মৃত ভেবে। তার পর খাঁচার দরজাটি খুলে দিয়ে হয়তো চাকর-বাকর কাউকে ডাকার জন্য পিছন ফিরতেই অামি সুরুৎ করে খাঁচা থেকে বের হয়ে কাছেই একটি গাছের ডালে বসে পড়ি। অামাকে দেখে বণিক অবাক হয়ে জানতে চাইলো, ‘এটা কি হলো? তুমি মরোনি?’

কাকাতুয়া তখনও বলে যাচ্ছে- ‘না, অামি মরার ভান করে ছিলাম। যেমনটি অামার দেশী কাকাতুয়াটি করেছিল। সে মরার ভান করে পড়ে গিয়ে অামাকে জানাতে চেয়েছিল-‘যদি মুক্তি পেতে চাও, তবে মরার ভান করো’। সেই থেকে অামি অন্যদেরকেও মুক্তির উপায়টি বলে বেড়ায়।

অামার প্রাণ বায়ু ততক্ষণে বের হবার পথে। তবু কাকাতুয়ার কাছে জানতে চাইলাম, ‘ অামাদের মুক্তির উপায়ও কি তুমি তাই মনে করো?’

কাকাতুয়াটি হেসে বললো, ‘ তুমি বেঁচে গেছো কেন জানো? ওরা ভেবেছিল তুমি মারা গেছো তাই’।

আরও খবর

(Visited 1 times, 1 visits today)

Editor : Rahmatullah Bin Habib


55/B, Purana Palton, Dhaka-1000


Mobile : 01734 255166 & 01785 809246 । Email : nobosongbad@gmail.com


copyright @nobosongbad.com


একটি খাঁচা ও কাকাতুয়ার গল্প